আফ্রিকার সেরেঙ্গেটি বা বিস্তীর্ণ কোনো প্রান্তর যেখানে দুপুরের কড়া রোদ চামড়া পুড়িয়ে দেয় সেখানে একটি মৃত জেব্রা বা ওয়াইল্ডবিস্ট পড়ে থাকলে তার চারপাশে যে দৃশ্য তৈরি হয় তা খুব একটা মনোরম নয়। পচতে শুরু করা মাংসের উৎকট গন্ধ বাতাসকে ভারী করে তোলে যা অধিকাংশ প্রাণীর জন্যই অসহ্য। কিন্তু আকাশের অনেক উঁচুতে চক্কর কাটতে থাকা শকুনের দলের জন্য এই গন্ধটি হলো একটি ভূরিভোজের নিমন্ত্রণ। বিশালাকার ডানা মেলে তারা যখন মৃতদেহের ওপর নেমে আসে তখন তাদের চেহারা বা খাদ্যাভ্যাস দেখে আমাদের অনেকেরই গা শিউরে ওঠে। তারা এমন মাংস ছিঁড়ে খায় যা অ্যানথ্রাক্স বা কলেরার মতো মারাত্মক জীবাণুতে ঠাসা। একটি সাধারণ প্রাণী বা মানুষের পক্ষে এই খাবার মুখে তোলা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু শকুনরা দিনের পর দিন এই বিষাক্ত পচা মাংস খেয়েও দিব্যি সুস্থ থাকে এবং আকাশে দাপিয়ে বেড়ায়। প্রকৃতির এই ঝাড়ুদাররা আসলে কীভাবে মৃত্যুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে তা জীববিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
শকুনের এই অবিশ্বাস্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রধান রহস্য লুকিয়ে আছে তাদের পাকস্থলীতে। মানুষের পাকস্থলী যেখানে খাবার হজম করার জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার এসিড তৈরি করে শকুনের পাকস্থলী সেখানে আক্ষরিক অর্থেই একটি কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি। বিজ্ঞানীদের মতে শকুনের পাকস্থলীর পিএইচ মান এক এর কাছাকাছি যা অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যাটারি এসিডের সঙ্গে তুলনীয়। এই এসিড এতটাই তীব্র যে তা শুধু পচা মাংস নয় বরং শক্ত হাড় এমনকি কিছু ধাতব পদার্থও গলিয়ে ফেলতে সক্ষম। মৃত প্রাণীর শরীরে থাকা অ্যানথ্রাক্স বা বটুলিজমের মতো ভয়ঙ্কর সব ব্যাকটেরিয়া যখন শকুনের পেটে প্রবেশ করে তখন এই এসিডের সাগরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ধ্বংস হয়ে যায়। সহজ কথায় শকুনের পেট হলো এমন এক অগ্নিকুণ্ড যেখানে রোগজীবাণু প্রবেশ করার পর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ফলে যে মাংস খেয়ে একটি শেয়াল বা হায়েনা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে শকুন তা হজম করে ফেলে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই।
| মৃতদেহ ঘিরে দুইটি শকুন। (প্রতীকী চিত্র) ছবি: ক্রেইগ লোভেল। |
তবে শুধু এসিড দিয়েই সব জীবাণু ধ্বংস করা যায় না। কিছু অতিশয় চতুর ব্যাকটেরিয়া এই এসিডের বাধা টপকে অন্ত্রে পৌঁছে যেতে পারে। এখানেই কাজ শুরু করে শকুনের দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা হলো তাদের শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ডেনমার্কের একদল গবেষক শকুনের জিনোম সিকোয়েন্স বা জিনগত গঠন বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে এদের শরীরে এমন কিছু বিশেষ জিন রয়েছে যা কোষকে জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। সাধারণ প্রাণীর অন্ত্রে যেসব ব্যাকটেরিয়া প্রাণঘাতী সংক্রমণ তৈরি করে শকুনের অন্ত্রে সেই একই ব্যাকটেরিয়া বা মাইক্রোবায়োম শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে। ক্লস্ট্রিডিয়া এবং ফিউসোব্যাকটেরিয়া নামের দুটি ব্যাকটেরিয়া যা অন্য প্রাণীর জন্য বিষাক্ত তা শকুনের অন্ত্রে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। বিবর্তনের ধারায় শকুনরা এই জীবাণুগুলোর সঙ্গে একধরনের সন্ধি করে নিয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শকুনের ক্ষতি তো করেই না বরং খাবার দ্রুত ভেঙে হজম করতে সাহায্য করে। এটি যেন বিষকে বিষ দিয়ে ক্ষয় করার এক প্রাকৃতিক কৌশল।
শকুনের বাহ্যিক গঠনও তাদের এই নোংরা কাজের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। আমরা প্রায়ই শকুনের পালকহীন টাক মাথা দেখে ভাবি যে দেখতে কদাকার। কিন্তু এই টাক মাথা আসলে তাদের হাইজিন বা পরিচ্ছন্নতার একটি অংশ। শকুনকে যখন মৃত পশুর দেহের গভীর থেকে মাংস ছিঁড়ে আনতে হয় তখন তাদের মাথা ও ঘাড় রক্ত এবং পচা মাংসে মাখামাখি হয়ে যায়। যদি সেখানে ঘন পালক থাকত তবে সেই রক্ত ও মাংস জমে জীবাণুর বাসা তৈরি করত যা পরিষ্কার করা ছিল অসম্ভব। পালকহীন চামড়া রোদে খুব সহজেই শুকিয়ে যায় এবং জীবাণু মরে যায়। এছাড়া শকুনদের আরও একটি অদ্ভুত অভ্যাস আছে যা শুনলে অস্বস্তি লাগতে পারে কিন্তু তা বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত কার্যকর। তারা নিজেদের পায়ের ওপর মলত্যাগ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ইউরোহিড্রোসিস। তাদের মলের মধ্যে থাকা শক্তিশালী ইউরিক এসিড পায়ের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে স্যানিটাইজারের কাজ করে এবং একই সঙ্গে শরীরের অতিরিক্ত তাপ বের করে দিতে সাহায্য করে।
| জেব্রার মৃতদেহ ঘিরে শকুনের ভোজ। ছবি: ক্রেইগ লোভেল। |
শকুনের এই সুপারপাওয়ার বা বিশেষ ক্ষমতা শুধু তাদের নিজেদের জন্যই নয় বরং পুরো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য। নব্বইয়ের দশকে ভারতে যখন ডাইক্লোফেনাক নামক একটি পশু ওষুধের প্রভাবে লাখ লাখ শকুন মারা যেতে শুরু করে তখন পরিবেশের ওপর এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। মৃত পশু খাওয়ার মতো কেউ ছিল না ফলে সেগুলো পচে জল ও বাতাস দূষিত করতে থাকে। এর ফলস্বরূপ রাস্তার কুকুরের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং জলাতঙ্ক বা র্যাবিস রোগের প্রকোপ মহামারি আকার ধারণ করে। শকুনরা পরিবেশের এমন এক ডেড এন্ড বা শেষ সীমানা যেখানে এসে মারাত্মক সব রোগজীবাণুর যাত্রা শেষ হয়। তারা যদি এই জীবাণুযুক্ত মাংস খেয়ে হজম না করত তবে অ্যানথ্রাক্স বা যক্ষ্মার মতো রোগগুলো বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী ও মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলত।
প্রকৃতির এই আপাত কুৎসিত প্রাণীটি আসলে আমাদের অগোচরে এক বিশাল সুরক্ষা প্রাচীর তৈরি করে রেখেছে। মৃতদেহের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়া শকুনকে আমরা মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে দেখি কিন্তু আদতে তারা জীবনেরই রক্ষক। তাদের শক্তিশালী এসিড আর অদ্ভুত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিবর্তনের এক নিখুঁত উদাহরণ যা শিখিয়েছে কীভাবে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে হয়। তাই পরের বার আকাশে কোনো শকুনকে ডানা মেলতে দেখলে বা কোনো মৃত প্রাণীর পাশে বসে থাকতে দেখলে ঘৃণার চোখে না দেখে শ্রদ্ধার চোখে দেখবেন। কারণ তারা না থাকলে এই সুন্দর পৃথিবীটা হয়তো জীবাণুর এক ভাগাড়ে পরিণত হতো।